
স্টাফ রিপোর্টার:
ময়মনসিংহের ফুলপুরে এক চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় ফুলপুর থানা পুলিশের ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংযোজন ও বিকৃত তদন্ত’ প্রক্রিয়ায় আদালতকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মামলার এজাহার থেকে শুরু করে সুরতহাল, মেডিকেল রিপোর্ট ও চূড়ান্ত চার্জশীট—এই চারটি মূল নথিতে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য দেখা গেলেও সেই নথির ভিত্তিতেই আসামি জাকারিয়া ফকিরের পরিবারকে মানবেতর জীবনযাপনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং পরবর্তীতে ঘুষের দাবিতে ব্যর্থতা থেকে তদন্ত কর্মকর্তা এমন একটি আইনি জটিলতা তৈরি করেছেন যেখানে ১১ সদস্যের একটি পরিবার চরম দুর্দশার শিকার।
ফুলপুর থানার মামলা নং–১০, তারিখ ১৭/০৫/২০২৪ ইং-এর নথিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় প্রতিটি ধাপে তথ্যের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে ডান পায়ের নিচে আঘাত, পরে গলা চেপে ধরা। মেডিক্যাল রিপোর্ট বলছে শুধুমাত্র ডান পায়ের নিচে আঘাতের চিহ্নের কথা। কিন্তু মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে ভিকটিমের পেটের ওপর বসে বুকে আঘাত করার কথা (যা নতুন বিবরণ)
প্রদত্ত মেডিক্যাল রিপোর্টে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি ও প্রাপ্ত আঘাত মৃত্যু ঘটানোর মতো যথেষ্ট ছিল না বলা হলেও মেডিকেল রিপোর্টের এই ভাষ্য চার্জশীটে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা পুলিশী ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে মেডিক্যাল রিপোর্টে যেখানে গলা চেপে ধরা, বুকে আঘাত বা পেটে বসার কোনো আলামতই পাওয়া যায়নি সেখানে চার্জশীটে এই গুরুতর নতুন বিবরণ সংযোজন করা তদন্তের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার একটি স্পষ্ট অপপ্রয়াস।
আসামি জাকারিয়া ফকিরের পরিবার অভিযোগ করেন মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মূল কারণ হলো তদন্ত কর্মকর্তার ঘুষ দাবি পূর্ণ না হওয়া।
> জাকারিয়া ফকিরের অভিযোগ: “থানার এসআই মুহাম্মদ শফিকুল আলম আমার কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। ঘুষ না দেওয়ায় মেডিকেল রিপোর্টে হত্যা সংঘটিত হয়নি বলা সত্ত্বেও আদালতে নাটক সাজিয়ে হত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে চার্জশীট দাখিল করা হয়। আমরা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছি।”
অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা অন্যত্র বদলী হয়ে যাবার ফলে তার বক্তব্য নেয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ফুলপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল হাদীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা তদন্তে যা পেয়েছি, তাই বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করেছি। আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। থানায় কোনো ঘুষ লেনদেন হয় না।”
জাকারিয়া ফকিরের পরিবার দাবি করছে তাদের প্রতিবাদের কারণেই তারা এমন হয়রানির শিকার। জানা যায় আব্দুস সালাম ফকিরের অবৈধভাবে ৬২ শতাংশ জমি নামজারি করার প্রতিবাদ ও পুকুর পুনঃখননে বাড়ির ঝুঁকির প্রতিবাদ করায় জাকারিয়া ফকিরের ওপর হামলা চালানো হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো এই মামলায় জাকারিয়ার পরিবারের একাধিক নিরপরাধ সদস্যকেও আসামি করা হয়েছে যেখানে রেহাই পায়নি বয়োবৃদ্ধ পিতা, পর্দানশীন মাতা থেকে শিশু কন্যা জাকিয়াও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান পুলিশ তদন্তকালে ঘটনাস্থলের সাক্ষীদের বাড়িতে গিয়ে মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় ভয়ে তাঁরা মুখ বন্ধ করে থাকেন।
স্থানীয় সূত্র এবং জাকারিয়া ফকিরের পরিবার দাবি করে বাদী আব্দুস সালাম ফকির ৪০ বছর পূর্বে ঢাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য উমর খাঁর মাথা ফাটিয়ে এলাকা ছেড়ে রাঙামাটির বিলাইছড়ি গিয়ে আত্মগোপন করেন। দীর্ঘদিন সেখানে থেকে পাহাড়ি কাঠের অবৈধ ব্যবসা করে কোটিপতি বনে যান এবং বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা সভাপতি হয়ে উঠেন। তিনি তার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিরীহ এই পরিবারটিকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ধ্বংস করছেন। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন জাকারিয়া ফকিরের ভাই জুনায়েদ ফকির ২০১৭ সালে সালাম ফকিরদের সাথে একইরূপ ঝগড়ার কারণে মৃত্যুবরণ করলেও জাকারিয়া ফকিরের পরিবার মামলাবাজ না হওয়ায় ধৈর্যশীলতা দেখিয়ে কোনো হয়রানিমূলক মামলা করেননি—অথচ আজ সেই ধৈর্যশীল পরিবারই একইরূপ ঘটনার বিপরীতে মামলাবাজ সালাম ফকিরের কারণে চরম হয়রানির শিকার।
বর্তমানে আসামী উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও বাদী পক্ষ একটি তদন্তবিহীন জিডি দাখিল করে এবং প্রকৃত মেডিকেল রিপোর্ট গোপন রেখে আপিল বিভাগকে বিভ্রান্ত করে সেই জামিন স্থগিত করাতে সক্ষম হন। জাকারিয়া ফকির সাংবাদিকদের মাধ্যমে আশা প্রকাশ করেন যে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যেন তার এই বিষয়টি নজরে নিয়ে মেডিকেল রিপোর্টসহ মামলার নথি পুনঃপর্যালোচনা করেন। অন্যথায় এমন বিকৃত তদন্ত প্রক্রিয়া আদালতের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং বহু নিরীহ মানুষ প্রতারিত হতে পারে বলে শঙ্কা জেগে উঠে।
