Header Image

ফুলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলা তিন শতাব্দীর ইতিহাসে মিশে থাকা লোকসংস্কৃতির মহাযজ্ঞ

 

ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি :

একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, ঢাংগুলি, চড়ইভাতি, মার্বেল, কানামাছি, ইচিংবিচিংসহ নানা রকম খেলাধুলা। আধুনিকতার আগ্রাসনে আজ এসব খেলা শিশু-কিশোরদের কাছে প্রায় অপরিচিত। সময়ের স্রোতে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বহু লোকজ ঐতিহ্য। তবে সবকিছুর মাঝেও ব্যতিক্রম হয়ে আজও টিকে আছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার দেওখোলা ইউনিয়নে শতবর্ষী ঐতিহ্য গুটি খেলা, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত হুম গুটি বা গুম গুটি নামে।

বুধবার (৩০ শে পৌষ,১৪ জানুয়ারি) দুপুরে ফুলবাড়িয়া উপজেলার তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামে ধানের পতিত জমিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলার ২৬৭তম আসর। খেলাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। আয়োজনের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে নানা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে স্থানীয় হুম গুটি স্মৃতি সংসদ।

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এই খেলার প্রচলন থাকলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়ে মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী ও বৈলরের জমিদার হেম চন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির সীমানা ও পরিমাপ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে। ‘পরগনা’ ও ‘তালুক’ এলাকার জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে দুই জমিদার তাদের প্রজাদের মধ্যে শক্তি ও কৌশলের প্রতিযোগিতা হিসেবে আয়োজন করেন এই গুটি খেলা।

খেলায় বিজয়ী পক্ষের এলাকার জমির পরিমাপ নির্ধারিত হয় সাড়ে ৬ শতাংশে এক কাঠা এবং পরাজিত পক্ষের এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রজারা খেলায় বিজয়ী হলে সেই নিয়ম আজও বহাল রয়েছে।

পৌষ মাসের শেষ দিনকে অর্থাৎ বাংলা মাসের ৩০পৌষ ঐদিন ফুলবাড়িয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘পহুরা’। এই দিনকে ঘিরেই বসে গ্রামীণ মেলা। খেলার মাঠের চারপাশে জমে ওঠে লোকজ উৎসব, আশপাশের গ্রামে গ্রামে চলে আনন্দ আয়োজন। ঘরে ঘরে জ্বলে চুলা, তৈরি হয় শীতের নানা রকম পিঠা ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। কোথাও গরু, কোথাও খাসি জবাই সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল পরিণত হয় এক বিশাল লোকসংস্কৃতির উৎসবে।

গুটি খেলার মূল আকর্ষণ হলো প্রায় ৪০ কেজি ওজনের পিতলের আবরণে মোড়ানো গোলাকার বল, যাকে বলা হয় ‘গুটি’। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ—এই চার ভাগে বিভক্ত হয়ে খেলোয়াড়রা খেলায় অংশ নেন। এখানে নেই কোনো রেফারি, নেই নির্দিষ্ট সময়সীমা বা খেলোয়াড়ের সংখ্যা।

দুপুর গড়াতেই মাঠে ভিড় জমায় হাজারো মানুষ। সন্ধ্যার পর দৃশ্যপট আরও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে ভেসে আসে ‘হুম হুম’ শব্দ, টর্চলাইটের আলোয় আলোকিত হয় বিশাল মাঠ। রাতের কোনো এক সময়ে কৌশলে হাজারো খেলোয়াড়ের ভিড়ের মধ্যে গুটিকে লুকিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় খেলা।

হুম গুটি স্মৃতি সংসদের সভাপতি ও নাট্যকার আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন,
“জমিদারদের জমির পরিমাপ সংক্রান্ত বিরোধ একসময় ‘হুম গুটি’ খেলার মাধ্যমেই মীমাংসা হয়েছিল। এই খেলাটি আমাদের শিকড়ের ঐতিহ্য। আমার পূর্বপুরুষরা এই আয়োজন শুরু করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষ দিনে আমরা খেলাটি আয়োজন করি। এ বছর অনুষ্ঠিত হলো ২৬৭তম আসর।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!