নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ থেকে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে বদলির পরও ‘পছন্দের কর্মস্থল’ পাওয়ার চেষ্টা এবং বদলি-পোস্টিং প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বন প্রহরী (ফরেস্ট গার্ড) মো. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর থেকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক সুবিধাজনক কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।
ফৌজদারহাট থেকে কক্সবাজারে বদলি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী সর্বশেষ চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ফৌজদারহাট চেক স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে তাকে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে বদলি করা হয়।
প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ আগস্ট তাকে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে বদলি করা হয়। একই প্রতিবেদনে বন বিভাগের সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, এর আগে ফৌজদারহাটে এক বছর মেয়াদি পোস্টিং থাকলেও তিনি সেখানে এক বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন।
তবে বদলি আদেশের পূর্ণাঙ্গ নথি, পূর্ববর্তী পোস্টিংয়ের সময়সীমা এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজপত্র হাতে নিয়ে বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘পছন্দের পোস্টিং’ পাওয়ার চেষ্টা?
বন বিভাগের কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে বদলির পরও পছন্দের এলাকায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত আবেদন, অফিস আদেশ বা অন্য কোনো নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, বদলি করা কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বনকর্মচারীর অভিযোগ, স্থানীয় পরিচিতি ও প্রভাব ব্যবহার করে দপ্তরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়।
তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পোস্টিং পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া কারও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অনলাইন ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
চোরাই কাঠের চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও চোরাই কাঠের পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।
কেউ কেউ দাবি করছেন, বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় কাঠ পরিবহন ও বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে এ অভিযোগের পক্ষে মামলার নথি, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা কিংবা আদালতের কোনো নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে চোরাই কাঠের ব্যবসার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগকে এই পর্যায়ে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
বৃহত্তর প্রশ্ন বদলি-পোস্টিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে
গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বদলি ও পোস্টিং ব্যবস্থা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে একটি প্রতিবেদনে বদলি-পদায়নকে ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল; তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা আদালতের নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে বিভাগটির বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট, চেক স্টেশন ও অন্যান্য ইউনিটের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ফৌজদারহাট চেক স্টেশনও বিভাগের একটি ইউনিট হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
প্রয়োজন নথিভিত্তিক তদন্ত
বন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নীতিমালা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বদলি আদেশ, যোগদানপত্র, দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি, পোস্টিং আদেশ এবং কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অবৈধ কাঠ ব্যবসার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ ও কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বা সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
পরবর্তী অনুসন্ধানে যা যাচাই করা হবে
বদলি আদেশে আসলে কী বলা হয়েছে, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে তার যোগদানের তারিখ কী, কোথায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, পূর্ববর্তী কর্মস্থলে তিনি কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সরকারি নথি রয়েছে কি না—এসব বিষয় নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা হবে পরবর্তী পর্বে।